যুক্তরাজ্যের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির প্রায় ৬০ জন পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ফিলিস্তিনকে অবিলম্বে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তাঁরা গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ আখ্যা দিয়ে এটি বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন। শনিবার (১২ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই আহ্বান জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই উদ্যোগটি নিয়েছে লেবার ফ্রেন্ডস অব প্যালেস্টাইন অ্যান্ড দ্য মিডল ইস্ট নামে একটি সংগঠন, যা লেবার পার্টির মধ্যে ফিলিস্তিনপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ৫৯ জন এমপির মধ্যে লেবার পার্টির মধ্যপন্থী ও বামপন্থী উভয় অংশের প্রতিনিধিরা রয়েছেন, যা এই দাবির ব্যাপকতা ও দলীয় ঐক্যের ইঙ্গিত দেয়।
চিঠিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একটি পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাফাহ শহরের ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি অস্থায়ী শিবির বা তথাকথিত “মানবিক শহর” গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে গাজার সমস্ত বাসিন্দাকে স্থানান্তরিত করা হবে। এমপিরা এই পদক্ষেপকে “জোরপূর্বক জনসংখ্যা অপসারণ” এবং “ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়েছে: “গাজার সব ফিলিস্তিনি নাগরিককে রাফাহে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখার যে পরিকল্পনার কথা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, তা এক ধরনের জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়া। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।”
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি, এমপিরা চিঠিতে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন যা ফিলিস্তিনি জনগণের মানবিক সহায়তা ও অধিকার সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর অর্থায়ন পুনরায় চালু করার দাবি; ইসরায়েলি অভিযোগের পর বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ইউএনআরডব্লিউএ-এর অর্থায়ন স্থগিত করেছিল, তবে এমপিরা এই অর্থায়ন দ্রুত পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন, কারণ এই সংস্থা গাজার লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনির জন্য জীবন রক্ষাকারী সহায়তা প্রদান করে। এছাড়াও, অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে; এমপিদের যুক্তি, এই বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং এগুলো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবৈধ দখলের প্রতীক।
ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মুক্তির বিষয়েও চিঠিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এমপিরা তাঁদের দাবির সপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরেছেন: “আমরা যদি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দিই, তাহলে নিজেরাই আমাদের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতিকে দুর্বল করে ফেলি। এর ফলে এই বার্তা যায় যে বর্তমান দখলদারিত্ব ও স্থিতাবস্থা অব্যাহত রাখা যাবে, যা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ধীরে ধীরে দখল ও অন্তর্ভুক্তির পথ তৈরি করে দেয়।” তাঁদের মতে, ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল একটি নৈতিক অবস্থান নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। এই চিঠিটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন গাজার মানবিক পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন করে চাপ অনুভব করছে। লেবার পার্টির এই পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক নীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে আরও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে সরকারকে বাধ্য করতে পারে।
