বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বান্দরবান পার্বত্য জেলা, প্রকৃতির এক অসাধারণ লীলাভূমি। উঁচু-নিচু পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাঁকখালীর মতো খরস্রোতা নদীর কলতান—সব মিলিয়ে বান্দরবান যেন এক মায়াবী জগত। কিন্তু এই অপরূপ জেলার নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মজার কিংবদন্তি, যা স্থানীয় লোককথায় আজও জীবন্ত।
বান্দরবান নামের সঙ্গে মিশে আছে বানরের এক বিস্ময়কর কাহিনি। প্রচলিত আছে, একসময় এই অঞ্চলে অসংখ্য বানরের বসবাস ছিল। শহরের প্রবেশদ্বারের কাছে একটি ছড়ার (ছোট নদী) পাড়ের পাহাড়ে তারা নিয়মিত লবণ খেতে আসত। একদিন টানা বৃষ্টির কারণে ছড়ার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বানরের দল ছড়া পার হয়ে পাহাড়ে যেতে পারছিল না। তখন বুদ্ধি খাটিয়ে তারা একে অপরকে ধরে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হয়—যেন একটি জীবন্ত বাঁধ তৈরি করেছে!
এই অসাধারণ দৃশ্য দেখে স্থানীয় জনপদ এই জায়গাটির নাম দেয় “ম্যাঅকছি ছড়া”। মারমা ভাষায় ‘ম্যাঅক’ মানে বানর আর ‘ছিঃ’ মানে বাঁধ। কালের পরিক্রমায় এবং বাংলা ভাষাভাষীদের উচ্চারণের সুবিধার্থে এই নামটিই রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়িয়েছে “বান্দরবান”। বর্তমানে সরকারি নথিপত্রেও এই নামটিই স্থায়ী। তবে, মারমা জনগোষ্ঠীর কাছে এর আদি নাম আজও “রদ ক্যওচি ম্রো”। বানরের এই ‘বাঁধ’ তৈরির ঘটনাই যে এই নয়নাভিরাম জেলার নামের উৎস, তা সত্যিই এক দারুণ মজার তথ্য।
বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি এর প্রশাসনিক ইতিহাসও বেশ সুদীর্ঘ। ব্রিটিশ শাসন আমলে, ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, এবং বান্দরবান তখন এর অধীনেই ছিল। সেই সময়ে ক্যাপ্টেন মাগ্রেথ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার প্রথম সুপারিনট্যানডেন্ট। ১৮৬৭ সালে এই পদটি আরও বিস্তৃত হয়ে ‘ডেপুটি কমিশনার’ পদে উন্নীত হয়, এবং টি. এইচ. লুইন হন প্রথম ডেপুটি কমিশনার।
১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি প্রধান সার্কেলে বিভক্ত করা হয়—চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল এবং বোমাং সার্কেল। প্রতিটি সার্কেলেরই নিজস্ব সার্কেল চীফ ছিলেন। বান্দরবান তখন বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার কারণে এর আদি নাম ছিল “বোমাং থং”।
বান্দরবান জেলা ১৯৫১ সালে মহকুমা হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং এটি তখন রাঙ্গামাটি জেলার একটি প্রশাসনিক ইউনিট ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর, ১৯৮১ সালের ১৮ই এপ্রিল, তৎকালীন লামা মহকুমার ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সীমাসহ সাতটি উপজেলার সমন্বয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা হিসেবে এটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক পরিচয় লাভ করে।
বান্দরবানের উত্তরে রাঙ্গামাটি জেলা, দক্ষিণে মায়ানমারের আরাকান, পূর্বে ভারত এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। এখানকার পাহাড় শ্রেণীগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০-১১০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, যার মধ্যে মিরিঞ্জা, ওয়ালটং, তামবাং এবং পলিতাই উল্লেখযোগ্য। এই জেলার জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র, যেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়, আর বার্ষিক বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ৩০৩১ মিমি। সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং বাঁকখালী—এই তিনটি প্রধান নদী জেলার শিরা-উপশিরার মতো বয়ে চলেছে, যা এখানকার জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বান্দরবান শুধু একটি জেলা নয়, এটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাস আর প্রকৃতির অপরূপ সমাহার। এর নামকরণ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক যাত্রা এবং বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি—সবকিছুই এই জেলাকে করেছে এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্র।
