বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের গভীরতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যারা একেবারে কাছ থেকে অনুভব করতে চান, তাদের জন্য বান্দরবানের তাজিংডং (বিজয়) এবং কেওক্রাডং পর্বতশৃঙ্গ দুটি এক দারুণ চ্যালেঞ্জ ও পুরস্কারের হাতছানি নিয়ে আসে। এই দুটি চূড়া কেবল তাদের উচ্চতা দিয়েই নয়, বরং তাদের চারপাশের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্যও বিখ্যাত, যা অভিযাত্রীদের মনে এক চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
রুমা উপজেলায় অবস্থিত তাজিংডং, যা স্থানীয়দের কাছে ‘বিজয়’ নামেও পরিচিত, একসময় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে গণ্য হতো। যদিও আধুনিক পরিমাপ অনুযায়ী সাকা হাফং এখন সর্বোচ্চ চূড়া, তাজিংডংয়ের প্রতি ট্রেকারদের আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমেনি। প্রায় ৩,১৭২ ফুট উচ্চতার এই চূড়ায় আরোহণ করা দুঃসাহসী ট্রেকারদের জন্য এক স্বপ্নপূরণের মতো।
তাজিংডং-এর পথ বেশ বন্ধুর এবং দীর্ঘ। ঘন জঙ্গল, খাড়া পাহাড়ী ঢাল এবং পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিতে হয়। এই অভিযান শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা নেয়। তবে, চূড়ায় পৌঁছানোর পর যে পুরস্কার মেলে, তা সকল কষ্টকে ম্লান করে দেয়। চূড়া থেকে চারপাশের মেঘে ঢাকা পাহাড়ের বিরামহীন দৃশ্য দেখা যায়, যা সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর। সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় তাজিংডং থেকে দেখা দিগন্তের দৃশ্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যখন মেঘেরা পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে খেলা করে, তখন মনে হয় যেন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। যারা প্রকৃত অর্থে ট্রেকিং এবং অফ-বিট ভ্রমণের স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য তাজিংডং এক অসাধারণ গন্তব্য।
প্রায় ৩,১০০ ফুট উচ্চতার কেওক্রাডং (বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত) বগালেকের পাশেই অবস্থিত এবং ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বগালেক থেকে কেওক্রাডং-এর দিকে হেঁটে যাওয়ার পথটা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি তার চূড়া থেকে দেখা চারপাশের মেঘে ঢাকা সবুজাভ পাহাড়ের সারি এক অসাধারণ অনুভূতি দেয়।
কেওক্রাডং-এর ট্রেকিং পথ বগালেকের চেয়ে কিছুটা বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, তবে পথের দু’পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আদিবাসী জনপদের সহজ জীবনযাত্রা এই যাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। শীতকালে যখন মেঘগুলো পাহাড়ের বুক ছুঁয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন আপনি মেঘের রাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছেন। চূড়ায় পৌঁছানোর পর ক্লান্তি দূর করতে আদিবাসী পরিচালিত ছোট ছোট বিশ্রামাগার রয়েছে, যেখানে রাত কাটানো যায়। রাতের বেলায় তারার আলোয় আলোকিত কেওক্রাডং-এর চূড়ায় বসে দূরের পাহাড়ের নীরবতা উপভোগ করা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
এই দুটি চূড়া জয় করা যারা পছন্দ করেন, তাদের জন্য বান্দরবানের এই স্থানগুলো প্রকৃতিকে একদম কাছে থেকে অনুভব করার এক অসামান্য সুযোগ করে দেয়। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আপনাকে প্রকৃতির আরও গভীরে নিয়ে যায় এবং আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
