নোয়াখালীতে বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত

নোয়াখালীতে সকাল থেকেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে সিক্ত। গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে জেলার ছয়টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল এখনো জলমগ্ন, যার কারণে লাখো মানুষ ঘরবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই অস্বাভাবিক জলাবদ্ধতা ও বন্যা পুরো জেলায় চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে।

জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নোয়াখালীর ৬টি উপজেলার ৫৭টি ইউনিয়নে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় এক লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে বেগমগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, সেনবাগ, সুবর্ণচর, কবিরহাট এবং সদর উপজেলার শতাধিক গ্রাম এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। বহু পরিবার তাদের বাড়িঘর ছেড়ে স্কুল, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে রান্নার উপকরণ, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ছয়টি উপজেলার ৫৭টি ইউনিয়নে মোট ৩৪ হাজার ৯৫০টি পরিবার বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন প্রায় ৯০ হাজার ৪০৩ মানুষ। এছাড়াও, সেনবাগ, কবিরহাট ও সুবর্ণচর উপজেলায় আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৭টি বসতঘর, এবং সুবর্ণচরে একটি ঘর সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জেলা শহরের আশপাশ এবং বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। অনেক বাড়ির ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কবিরহাট উপজেলার বাসিন্দা মো. সেলিম গণমাধ্যমকে জানান, গত তিন দিন বৃষ্টি না হওয়ায় যদিও কিছুটা পানি নেমেছিল, কিন্তু আজ সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পানিবন্দি বাসিন্দারা আবারও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা মানুষের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরেও অনেকে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছেন না, কারণ তাদের ঘর, রান্নাঘর, পুকুর—সবই পানির নিচে। অনেকেই ভেঙে পড়া ঘরে এক অমানবিক জীবন যাপন করছেন। এমনকি রোদ উঠলেও দুর্ভোগ পুরোপুরি কমছে না; বরং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।

সুবর্ণচরের কৃষক নুরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর ধানের জমিগুলো সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং বাড়ির ভেতরেও কোমর সমান পানি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এখন যদি আবার বৃষ্টি হয়, তাহলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, যেহেতু এখন বর্ষাকাল চলছে, তাই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হালকা বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে এবং এটি সামান্য বৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে তিনি জানান।

জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, জেলার ছয়টি উপজেলার ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ২৩ জন মানুষ এবং ১০৭টি গবাদিপশু আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ৫১টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৯টি ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নোয়াখালী জেলায় প্রায় ৭,২৬০ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও, ৪০ হাজার মৎস্য খামারির মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ৯৮৪ প্যাকেট শুকনো খাবার, ১৬ মেট্রিক টন চাল এবং ৬ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। বর্তমানে আরও ১,৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৪৮৪ মেট্রিক টন চাল এবং ১২ লাখ টাকা মজুদ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *