বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি কমে অর্থনীতিতে স্বস্তি

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) যে নেতিবাচক অবস্থা ছিল, তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ এই এগারো মাসে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিও আগের চেয়ে কমে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংবাদ। এই হালনাগাদ তথ্যগুলো রোববার (১৩ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) সংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে, দেশের রপ্তানি আয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর একটি বড় কারণ হলো, আগে রপ্তানির যে অর্থ পুরোপুরি দেশে আসত না বা আংশিকভাবে আসত, এখন তার পুরোটা আসছে। অন্যদিকে, দেশের শিল্প-কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির মতো পণ্য আমদানির খরচ খুব একটা বাড়েনি। এই সম্মিলিত প্রভাবের কারণে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে যে বিশাল ঘাটতি ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম এগারো মাসে (জুলাই-মে) মোট ৪ হাজার ৮৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর বিপরীতে, আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ২৫ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে এই সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের বাণিজ্য ঘাটতির (২ হাজার ২২ কোটি ডলার) তুলনায় ৪.১৭ শতাংশ কম, যা অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সূচক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স) বর্তমানে মাত্র ৪৩ কোটি ডলারের ঋণাত্মক অবস্থা রয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) একই সময়ে ৬১১ কোটি ডলারের বিশাল ঘাটতির তুলনায় অনেক কম, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার দিকে ইঙ্গিত করে।

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের (ওভারঅল ব্যালান্স) ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উন্নতি দেখা গেছে। জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত এই সূচকে ঘাটতি ছিল ১১৫ কোটি ডলার, যেখানে গত বছর (২০২৪) মে মাস শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৮৮ কোটি ডলার।

দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের এই উন্নতির পেছনে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ২৭.৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের (২১.৩৭ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় ২৮.৭ শতাংশ বেশি।

এছাড়াও, দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুলাই-মে মাসে বাংলাদেশ ১৩৫ কোটি ডলারের এফডিআই পেয়েছিল, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে ১৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তবে, দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট) এখনও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের এগারো মাসে শেয়ারবাজারে যা বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল, তার চেয়ে ১ কোটি ৩২ লাখ ডলার বেশি অর্থ চলে গেছে। এর আগের অর্থবছরেও শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল, যার পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৭ লাখ ডলার। এই অংশটি এখনও অর্থনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *